শ্রেণিকক্ষের শিক্ষকতায় এবং সমাজবিজ্ঞানের জটিল অনুধ্যানে জীবন কেটেছে প্রায় সাড়ে চার দশক। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় বারবার একটি সত্যই দেখেছি, জীবনের গতিরেখা কখনো একটি নির্দিষ্ট খাতার পৃষ্ঠায় বা রেজাল্ট শিটের প্রাপ্ত নম্বরে আটকে থাকে না। কিন্তু সম্প্রতি ঘোষিত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর দেশের যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা দেখে একজন শিক্ষক, সমাজবিজ্ঞানের একজন ছাত্র এবং একজন পিতা হিসেবে আমার হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে।
সার্বিক মূল্যায়নে গত দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বিপর্যয়কর ফলাফলের মুখোমুখি হয়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। এবার ১৮ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন। ১১টি বোর্ডে গড় পাসের হার ৬২.২৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় সাত লাখ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। কিন্তু পাসের হারের এই শুষ্ক অঙ্কের চেয়েও আমাকে স্তব্ধ ও বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে ফলাফল প্রকাশের পরপরই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে আসা তরুণদের আত্মহননের করুণ আর্তনাদ।
চট্টগ্রামের বাকলিয়া সিটি কর্পোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের আদনানুজ্জামান নিহাল, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার তানিয়া জাহান, শেরপুরের নকলা উপজেলার দিয়ামনি অন্তি, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের অভি বিশ্বাস, রাজশাহীর বাগমারা থেকে কারিনা পাল কিংবা মাদারীপুরের রাজৈর থেকে নেজলা পুইস্তা, এদের প্রতিটি মুখ আজ আমার চোখে ভাসছে। পরীক্ষা খারাপ হওয়ার মানসিক চাপ আর সামাজিক লজ্জার ভয়ে তারা একে একে নিজ হাতে নিজের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দিল। রাজশাহী, কুষ্টিয়া, চাঁদপুর, কুমিল্লা, চুয়াডাঙ্গাসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে ১০টি তাজা প্রাণের এভাবে ঝরে যাওয়ার খবর সত্যি মর্মান্তিক।
বেসরকারি সংস্থা ‘আঁচল ফাউন্ডেশন’-এর তথ্য আমাদের রক্তকে হিম করে দেয়। ২০২৫ সালে দেশে ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছিল। ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটি ছিল ৩১০, ২০২৩ সালে ৫১৩ এবং ২০২২ সালে ছিল ৫৩২ জন। গবেষণায় উঠে এসেছে, শিক্ষার্থীদের এই চরম পথ বেছে নেওয়ার পেছনে পড়াশোনার মানসিক চাপ এবং ফলাফলের বিপর্যয় সবচেয়ে বড় নিয়ামক।
একজন শিক্ষার্থী যখন অকৃতকার্য হয় বা কাঙ্ক্ষিত ফল পায় না, তখন সেটি কেবল তার একার ব্যর্থতা নয়; তা মূলত আমাদের সমাজ, পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থার সম্মিলিত ব্যর্থতা। কিন্তু আমরা সমাজ হিসেবে সাফল্য-ব্যর্থতার একমাত্র মাপকাঠি বানিয়ে ফেলেছি পরীক্ষার রেজাল্টকে। জিপিএ-৫ কিংবা এ+ পাওয়ার এই অন্ধ প্রতিযোগিতায় আমরা আমাদের সন্তানদের মনস্তাত্ত্বিক সুরক্ষা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি। এই ব্যর্থতার দায় আমি এড়াতে পারি না। এই দশটি তরুণের অকালপ্রস্থানে আমি গভীরভাবে ব্যথিত, আমি চোখের জল ধরে রাখতে পারিনি। আমি হাত জোড় করে ক্ষমা চাই আমার সেই সন্তানদের কাছে, তোমাদের এই অকাল মৃত্যুর জন্য মূলত আমরাই দায়ী।
সমস্যার মূল কারণ: পরিবার, প্রাতিষ্ঠানিক ও শিক্ষাক্রমের দুর্বলতা
এই সংকটের শেকড় রয়েছে আমাদের পরিবার ও সমাজব্যবস্থার গভীরে। পরিবার থেকেই একটি শিশুর চরিত্র ও মানসিক বিকাশ ঘটে। আমাদের সন্তানেরা কখন পড়ছে, কখন খেলছে, কার সাথে মিশছে, তাদের পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন বা ক্লাসে তাদের পারফর্ম্যান্স কেমন, এসব খেয়াল রাখা পরিবারেরই মূল দায়িত্ব। অথচ আজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমরা পারিবারিক সেই মমতার বন্ধন হারিয়ে ফেলছি। সন্তানের অনুভূতি না বুঝে কেবল ভালো ফলাফলের চাপ তৈরি করছি।
দ্বিতীয়ত, আমাদের কোচিং নির্ভরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পাঠদানের গলদ। প্রচুর কোচিং সেন্টারে পড়ে বা প্রাইভেট টিউটরের কাছে গিয়েও কীভাবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়? কীভাবে ৩০০টিরও বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব শিক্ষার্থী ফেল করে?
আমি আমার নিজের একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমার এক প্রতিবেশী এসে আমাকে বললেন, “আপনি তো শিক্ষক মানুষ, একটু দেখুন তো, সামনে ওর পাবলিক পরীক্ষা।” আমি ছেলেটিকে অত্যন্ত সহজ ও মৌলিক কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু সে উত্তর দিতে পারলো না। অথচ সে দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় কোচিং করছে। যারা তাকে পড়াচ্ছে, তারা কি আদৌ তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে? তারা কি শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিহ্নিত করে তার আলাদা যত্ন নিয়েছিল? নেয়নি।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে ঘন ঘন সিলেবাস ও পরীক্ষা পদ্ধতির রূপান্তর। সৃজনশীল পদ্ধতির মতো আধুনিক ধারণাকে যখন শ্রেণিকক্ষে সঠিকভাবে অনুধাবন বা বাস্তবায়ন না করেই শিক্ষার্থীদের ওপর বারবার চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা তাদের শিখনের মান বাড়ানোর বদলে বরং ভীতি ও বিভ্রান্তির জন্ম দেয়। প্রতি কয়েক বছর পরপর শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরীক্ষানিরীক্ষা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মানসিক ভারসাম্য বিনষ্ট করছে এবং শিক্ষকদের ওপরও অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি করছে। নির্দিষ্ট একটি টেকসই শিক্ষা রূপরেখা প্রণয়ন না করে এভাবে বারবার পরীক্ষার ধরন বদলালে শিখনফল অর্জনের মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যায়, যার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হয় শিক্ষার্থীদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।
এছাড়া, প্রাক-নির্বাচনী বা টেস্ট পরীক্ষায় অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের মূল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে যখন চূড়ান্ত ফলাফলের কৃত্রিম চিত্র সুন্দর রাখার চেষ্টা করা হয়, তখন সেটি তাদের ভেতর তীব্র হতাশা তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে এই পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের মানোন্নয়নের নামে বাণিজ্যিক ‘বিশেষ স্কুল কোচিং’ বা অতিরিক্ত প্রাইভেট পড়ার জন্য পরোক্ষ মানসিক চাপ প্রয়োগ করা হয়। মূল শ্রেণিকক্ষের দুর্বল পাঠদানকে গোপন রেখে কোচিংনির্ভর এই সমান্তরাল শিক্ষাকাঠামো কখনো কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। কোনো শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়লে তাকে বহিষ্কার বা অতিরিক্ত ফি-ভিত্তিক প্রাইভেশনের মুখোমুখি না করে, বরং শ্রেণিকক্ষেই বিশেষ পরিচর্যা (remedial teaching) দিয়ে মূলধারায় ফিরিয়ে আনা প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব হওয়া উচিত।
কারিগরি, মাদ্রাসা, সাধারণ কিংবা ইংলিশ মিডিয়াম, সব শিক্ষামাধ্যমেই গণিত, ইংরেজি ও আইসিটির মতো বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা দূর করতে ব্যর্থ হচ্ছি আমরা। সমস্যাটার একদম গোড়ায় গিয়ে সমাধান করতে হবে। আজ থেকে ৪২ বছর আগে যখন ফিলিপাইনে পড়তে যাই, তখন দেখেছি সাধারণ সবজি বা মাছ বিক্রেতাও সুন্দর ইংরেজিতে কথা বলছেন। অথচ আমাদের দেশে বছরের পর বছর হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে ইংরেজিতে অকৃতকার্য হচ্ছে। কারণ আমরা ক্লাসরুমে যথাযথ পাঠদান নিশ্চিত করতে পারছি না।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে আমাদের বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মনস্তাত্ত্বিক চাপ। শিক্ষার্থীদের বিকাশ ও ফলাফলের ওপর দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অস্থির পরিবেশ কিংবা সামাজিক অসংগতির প্রভাবকে কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। একটি স্থিতিশীল ও সুস্থ পরিবেশ যেখানে তরুণদের গঠনমূলক চিন্তার সুযোগ তৈরি করে, সেখানে চারপাশের অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তাদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটায় এবং ভবিষ্যতের প্রতি এক ধরনের তীব্র অনিশ্চয়তা ও হতাশা তৈরি করে। পরীক্ষা ও শিক্ষাজীবন যে কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন একক বিষয় নয়, বরং তা যে একটি দেশের সার্বিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের সাথে গভীরভাবে যুক্ত— এই সত্যটি আমরা অনেক সময়ই অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই।
আমাদের করণীয় ও সমাধানের পথ
এই ভয়াবহ ও অশুভ প্রবণতা থেকে আমাদের তরুণদের রক্ষা করতে হলে সম্মিলিতভাবে কিছু কাজ করা জরুরি:
১. পরিবারের সচেতনতা ও সুস্থ পরিবেশ: মা-বাবাকে সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে, যত্ন নিতে হবে এবং খোঁজখবর রাখতে হবে। কঠিন বা কঠোর হওয়ার প্রয়োজন নেই। ভালোবাসার আবহ তৈরি করে তাদের মোটিভেট করে পড়ার টেবিলে বসাতে হবে। সাফল্য বা ব্যর্থতা যাই হোক, সন্তানকে ভালোবাসতে হবে।
২. শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা: শ্রেণিকক্ষে সঠিক পাঠদানের দায় প্রতিটি স্কুলের দায়িত্বশীলদের নিতে হবে। উপজেলা পর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদেরও দায়িত্ব নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে এবং ভালো কাজের জন্য তাদের স্পেশাল ইনসেন্টিভ বা প্রণোদনা দিয়ে মোটিভেট করতে হবে।
৩. মানসিক ও শারীরিক বিকাশ: আজ থেকে আড়াই হাজার বছর আগে প্লেটো আদর্শ নাগরিকের জন্য শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার কথা বলেছিলেন। আমাদের সন্তানদের বিনোদনের ব্যবস্থা রাখতে হবে। তাদের খেলাধুলার পরিবেশ, সাংস্কৃতিক চর্চা ও বিভিন্ন সৃজনশীল কাজের সাথে যুক্ত করতে হবে। একটি সন্তানকে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবার, শিক্ষক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে একযোগে কাজ করতে হবে।
৪. সামাজিক শিক্ষা আন্দোলন: আমাদের দেশের তরুণেরা অনেক মেধাবী, তাদের কেবল ভালোবাসার অভাব ও সঠিক গাইডের অভাব। প্রতিটি গ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়ে বা কলেজে পড়ুয়া তরুণ-তরুণীরা আছেন। তাঁরা যদি তাঁদের নিজ নিজ এলাকার পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় গাইড করেন, তবে খুব সহজেই এই দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
৫. নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা: আমাদের শিক্ষার্থীদের মাদকমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও কিশোর গ্যাংমুক্ত নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে। অবহেলা না করে তাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে নজর দিতে হবে।
একটি পরীক্ষাই জীবনের শেষ কথা নয়। এ+ পাওয়ার চেয়ে ভালো মানুষ হওয়া এবং টিকে থাকা অনেক বেশি জরুরি। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে যাতে পাঠদানে কোনো ঘাটতি না থাকে।
আমরা যদি সত্যিকার অর্থে দায়িত্ব পালন করি, তবে আমাদের সন্তানেরা অকৃতকার্য হবে না। আমাদের আর নিষ্ক্রিয় থাকার সুযোগ নেই। আসুন, আমাদের সন্তানদের বিশ্বাস করি এবং তাদের পাশে থাকি। আর একটি শিক্ষার্থীও যেন হতাশায় আত্মহত্যা না করে, আসুন আজই সেই প্রতিজ্ঞা করি।
লেখক,
সাবেক উপাচার্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়,