জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য ব্লাইন্ড গার্ল অ্যান্ড অ্যান এলিফ্যান্ট (সাঁকোটা দুলছে)’ নির্বাচিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট কম্পিটিশন বিভাগে। এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ এই চলচ্চিত্র উৎসবের এবারের আসর আগামী ১২ থেকে ২১ জুন চীনের সাংহাই শহরে অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণে তরুণ প্রজন্মের নতুন সম্ভাবনার জানান দিচ্ছে এই নির্বাচন।
চলচ্চিত্রটির গল্প, চিত্রনাট্য ও পরিচালনা করেছেন ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদ। এটি তাঁর পাশাপাশি প্রযোজক মনোজ কুমার প্রামাণিক এবং বাংলাদেশের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান মনপাচিত্রেরও প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ছবিটি বাংলাদেশ ও জার্মানির যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে। বাংলাদেশের মনপাচিত্রের সঙ্গে জার্মানির মগডোর ফিল্ম এ প্রযোজনায় যুক্ত রয়েছে।
‘সাঁকোটা দুলছে’ চলচ্চিত্রের কাহিনি আবর্তিত হয়েছে গ্রামীণ বাংলাদেশের তিন নারীর জীবনকে ঘিরে। সমাজের প্রচলিত কুসংস্কার, পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা, রক্ষণশীলতা ও সামাজিক নিপীড়নের মধ্যে নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বাধীনতার পথ খুঁজে নেওয়ার সংগ্রাম উঠে এসেছে এতে। নারীদের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার নানা সংকটকে গ্রামীণ বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে পর্দায় তুলে ধরেছেন নির্মাতা।
সম্পূর্ণ সাদা-কালোতে নির্মিত চলচ্চিত্রটিতে নারীর জীবনসংগ্রামের পাশাপাশি বিশ্বাস, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। গল্প বলার ধরন ও নির্মাণশৈলীতে গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সমাজের প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে নারীর অবস্থানকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়েছে।
চলচ্চিত্রটির আন্তর্জাতিক নির্মাণযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন জার্মান প্রযোজক ক্রিস্টোফ থোকে। তিনি পোস্ট-প্রোডাকশন পর্যায়ে সহযোগী প্রযোজক হিসেবে প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে পরিচিত সমালোচক, প্রযোজক ও প্রোগ্রামার ডার্সি প্যাকুয়েট কনসাল্টিং প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন। চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক ফজলে হাসান শিশির সহ-প্রযোজক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।
নিজের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের এমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন পরিচালক ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদ। তিনি বলেন, গ্রামীণ বাংলাদেশে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, কুসংস্কার, রক্ষণশীলতা ও সামাজিক বিধিনিষেধ কীভাবে নারীদের জীবনে প্রভাব ফেলে। সেই বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই চলচ্চিত্রটির গল্পের জন্ম। সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হওয়াকে তিনি পুরো দলের জন্য বড় সম্মানের পাশাপাশি চলচ্চিত্রে উঠে আসা মানুষগুলোর জীবন ও অভিজ্ঞতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন।
প্রযোজক মনোজ কুমার প্রামাণিক বলেন, সীমিত অর্থ, অল্প অভিজ্ঞতা এবং একদল স্বপ্নবাজ তরুণ চলচ্চিত্রকর্মীকে নিয়ে ছবিটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। দীর্ঘদিনের শ্রম, ত্যাগ ও বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্রটি সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা করে নেওয়ায় তারা আনন্দিত। তাঁর মতে, স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতি তাদের যে অঙ্গীকার, এই নির্বাচন তারও একটি স্বীকৃতি।
চলচ্চিত্রটির সঙ্গে যুক্ত নির্মাতা ও কলাকুশলীদের আশা, সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে ‘সাঁকোটা দুলছে’ আন্তর্জাতিক দর্শকদের সামনে গ্রামীণ বাংলাদেশের জীবন ও নারীর সংগ্রামের একটি ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরতে সক্ষম হবে।