শিক্ষা থেকে দক্ষতা, দক্ষতা থেকে কর্মসংস্থান,এই ধারাবাহিকতাই পারে একটি জাতিকে এগিয়ে নিতে একজন মানুষ যখন নিজের নাম লিখতে পারেন, একটি নির্দেশনা পড়ে বুঝতে পারেন, প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে নিতে পারেন এবং নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন,তখনই প্রকৃত অর্থে তিনি শিক্ষার শক্তি অনুভব করেন। তাই সাক্ষরতা শুধু পড়তে ও লিখতে পারার সক্ষমতা নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, সচেতনতা এবং ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, নারী শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের ফলে দেশের সাক্ষরতার হার বেড়েছে। বর্তমানে দেশে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক ৯ শতাংশ। তবে এর বিপরীতে এখনো ২২ শতাংশের বেশি মানুষ নিরক্ষর, যারা প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে বিদ্যালয়বহির্ভূত ও ঝরে পড়া শিশু-কিশোর, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং শিক্ষা থেকে দূরে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ।
এই পরিসংখ্যান আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে, শুধু শিক্ষার হার বৃদ্ধি করলেই কি একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত হয়? উত্তর হলো, না। বর্তমান বিশ্বে টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন শিক্ষার সঙ্গে দক্ষতার সমন্বয়। কারণ কর্মসংস্থানের বাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং নতুন ধরনের পেশার বিকাশের ফলে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়, প্রয়োজন ব্যবহারিক দক্ষতা ও অভিযোজন ক্ষমতা।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে সাক্ষরতার ধারণাকেও নতুনভাবে দেখতে হবে। আজকের সাক্ষরতা মানে শুধু বই পড়া নয়; বরং তথ্য বোঝা, প্রযুক্তি ব্যবহার করা, সমস্যা সমাধান করা এবং নিজের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য শিক্ষা ও দক্ষতার সমন্বয় একটি উন্নত ভবিষ্যতের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে এ লক্ষ্য পূরণে কার্যকর সাক্ষরতা ও ব্যবহারিক কর্মদক্ষতা প্রশিক্ষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে কাজ করছে। বর্তমানে দেশের ৫৮ জেলার সদর উপজেলায় এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রথম ধাপে ঝরে পড়া ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী ৪ হাজার ৪৪০ জন কিশোর-কিশোরীকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়েছে।
এই কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো,এটি শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি সেতুবন্ধ তৈরি করছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে মোট ৪৬০ ঘণ্টার শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, যার মধ্যে ১০০ ঘণ্টা কার্যকর সাক্ষরতা এবং ৩৬০ ঘণ্টা দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ রয়েছে। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থী শুধু জ্ঞান অর্জন করছে না, বরং কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতাও অর্জন করছে।
এই ধরনের উদ্যোগের ফলাফল আশাব্যঞ্জক। নিবন্ধিত ৪ হাজার ৩১২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৪ হাজার ১৯৮ জন দক্ষ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩ হাজার ৮৮২ জন চাকরির সংযোগ পেয়েছেন এবং ৬০৩ জন সরাসরি কর্মসংস্থানে যুক্ত হয়েছেন। এই তথ্য প্রমাণ করে যে সঠিক প্রশিক্ষণ ও সুযোগ পেলে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি,সাক্ষরতা কার্যক্রমকে শুধু প্রকল্পভিত্তিক উদ্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অংশ। বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চল, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য আরও সহজলভ্য ও বাস্তবমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় অর্থনৈতিক সমস্যা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা কিংবা সচেতনতার অভাবে শিশুরা শিক্ষা থেকে ঝরে পড়ে। তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। একই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য জীবনমুখী শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে হবে।
বাংলাদেশ এখন জনসংখ্যার সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে হলে প্রত্যেক নাগরিককে শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগ দিতে হবে। একজন দক্ষ ও শিক্ষিত মানুষ শুধু নিজের জীবন পরিবর্তন করেন না; তিনি পরিবার, সমাজ এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও অবদান রাখেন।
সুতরাং সাক্ষরতা দিবস আমাদের শুধু একটি অর্জনের হিসাব মনে করিয়ে দেয় না; বরং আমাদের দায়িত্বের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা,যেখানে কোনো মানুষ শিক্ষা ও দক্ষতার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থাকবে না। কারণ একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন শুরু হয় তখনই, যখন তার প্রতিটি মানুষ জ্ঞান, দক্ষতা এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়।