ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার পোড়াবাড়ী বাজারে খিরু নদীর ওপর নির্মিত পুরোনো বেইলি সেতুটি এখন স্থানীয় মানুষের জন্য আতঙ্কের নাম। ভাঙাচোরা পাটাতন ও নড়বড়ে কাঠামো নিয়ে কোনো রকমে টিকে থাকা সেতুটি দিয়েই প্রতিদিন চলাচল করছে ছোট-বড় যানবাহন এবং হাজারো পথচারী। ঝুঁকিপূর্ণ এই সেতুর বিকল্প হিসেবে প্রায় ৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন একটি সেতু নির্মাণ করা হলেও জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় সেটি এখনো চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে দুই উপজেলার লাখো মানুষকে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়েই পুরোনো সেতু পার হতে হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বেইলি সেতুটির বিভিন্ন অংশের পাটাতন ভেঙে গর্ত তৈরি হয়েছে। যানবাহন চলাচলের সময় সেতুটি কেঁপে ওঠে। বিশেষ করে তিন চাকার যানবাহন পারাপারের সময় পথচারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বয়োবৃদ্ধ, নারী ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তবুও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে সবাইকে এই সেতু ব্যবহার করতে হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, খিরু নদীর একপারে ত্রিশাল উপজেলা এবং অন্যপারে ফুলবাড়িয়া উপজেলা। আশির দশকে নির্মিত বেইলি সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে দুই উপজেলার মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ব্যবহারের ফলে সেতুটি এখন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) চার বছর আগে পাশেই একটি নতুন সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ২০২২ সালে প্রায় ৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের নতুন সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। ৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির কাজ পায় এমসিই-এমএলএম (জেভি) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ২০২২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া কাজ ২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে দুই দফা সময় বাড়িয়েও প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে নতুন সেতুর মূল অবকাঠামোর নির্মাণকাজ শেষ হলেও সংযোগ সড়কের একটি অংশে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত জটিলতা থাকায় সেটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া যাচ্ছে না। সেতুর একপাশে সংযোগ সড়ক নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জমি এখনো পুরোপুরি বুঝে পাওয়া যায়নি।
মঠবাড়ী ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী তানিয়া বলেন, এই সেতু দিয়েই আমাদের প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়। সেতুতে উঠলেই ভয় লাগে। মনে হয়, এই বুঝি ভেঙে পড়বে। নতুন সেতুটি দ্রুত চালু করা প্রয়োজন। স্থানীয় বাসিন্দা মকবুল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “ভাঙা পাটাতনের কারণে অনেক মানুষ আহত হয়েছেন। মাঝেমধ্যে অটোরিকশাও উল্টে যায়। নতুন সেতু তৈরি হয়েও ব্যবহার করতে না পারাটা খুবই দুঃখজনক।”
জানা গেছে, সংযোগ সড়কের জন্য প্রায় সাড়ে ১৯ শতাংশ জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। জমির মালিকরা প্রতি শতাংশ জমির মূল্য ২৫ লাখ টাকা দাবি করছেন। জমিটির ওয়ারিশসহ মালিকের সংখ্যা প্রায় ২০ থেকে ২২ জন। জমির মালিকদের একজন বাসন্তী রানী চৌধুরী বলেন, আমার তিন শতক ভিটা জমি অধিগ্রহণের মধ্যে পড়েছে। এখনো কোনো ক্ষতিপূরণ পাইনি। টাকা না পাওয়া পর্যন্ত জমি ছাড়ব না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মকবুল হোসেন জানান, অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে এলজিইডির ত্রিশাল উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন বলেন, “নতুন সেতুর মূল অবকাঠামোর কাজ শেষ হয়েছে। সংযোগ সড়কের মাটি ভরাটের কাজ জমির মালিকদের বাধার কারণে করা যাচ্ছে না। ওই অংশের কাজ শেষ হলেই সেতুটি জনগণের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে।”
ত্রিশাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরাফাত সিদ্দিকী বলেন, “পোড়াবাড়ী সেতু দুই পাড়ের মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। পুরোনো সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় নতুন সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সংযোগ সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় জমির পরিমাপ ও অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার কাজ শেষ হয়েছে। জমির মূল্য নির্ধারণ করে অতিরিক্ত বাজেটের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, অতি দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে এবং সেতুটি জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা যাবে।”