দুই দশক পেরিয়ে ২১ বছরে পা দিয়েছে ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। ২০০৫ সালের ১ মার্চ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরের বছর ২৫ মে তিনিই বিশ্ববিদ্যালয়টির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। ফলে ভিত্তিপ্রস্তর ও উদ্বোধনী—দুই ফলকেই ছিল তার নাম।
তবে সময়ের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নকশা, সীমানা ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসায় ঐতিহাসিক সেই ভিত্তিপ্রস্তর এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে অবস্থান করছে। একইভাবে এর পাশের নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বটগাছটিও রয়েছে সীমানার বাইরে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে ১৫ একর। সে সময় ভিত্তিপ্রস্তরের পাশ দিয়ে প্রধান ফটক নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। পরে ফটকের স্থান পরিবর্তন করে অপেক্ষাকৃত মাঝামাঝি এলাকায় নির্মাণ করা হয়। ভিত্তিপ্রস্তরের পাশের সড়কও পরবর্তীতে বন্ধ করে সেখানে শিউলিমালা হল নির্মাণ করা হয়।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে সম্প্রসারণ করা হলেও পশ্চিম পাশে ভিত্তিপ্রস্তরসংলগ্ন জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা বাড়লেও ভিত্তিপ্রস্তরটি সীমানার বাইরে থেকে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় জমির পরিমাণ তুলনামূলক কম ছিল। তখন ভিত্তিপ্রস্তরের পাশ দিয়ে গেট নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও সবার সুবিধার কথা বিবেচনা করে পরবর্তীতে গেটটি মাঝামাঝি স্থানে নির্মাণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে জমি অধিগ্রহণ করা হলেও ভিত্তিপ্রস্তরের পাশের জমি অধিগ্রহণ করা হয়নি।
বটগাছটিও সীমানার বাইরে
ভিত্তিপ্রস্তরের পাশেই রয়েছে ‘নজরুল বটবৃক্ষ’ নামে পরিচিত একটি ঐতিহাসিক বটগাছ। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত আছে, কিশোর কাজী নজরুল ইসলাম ত্রিশালের দরিরামপুর ইংরেজি হাইস্কুলে পড়ার সময় স্কুল ফাঁকি দিয়ে নামাপাড়ার শুকনি বিলের পাড়ের এই বটগাছে উঠে বাঁশি বাজাতেন।
নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আবেগ ও ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। কিন্তু বর্তমানে বটগাছ ও ভিত্তিপ্রস্তর—দুটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অবহেলার অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল বিএনপি সরকারের ২০০১-২০০৬ মেয়াদে। বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগে জমি বরাদ্দ, আইন প্রণয়নসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম এগিয়ে যায়। ২০০৬ সালের ৯ মে জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০০৬’ পাস হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর খালেদা জিয়ার নামসংবলিত ভিত্তিপ্রস্তর ও উদ্বোধনী ফলক যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। ভিত্তিপ্রস্তরের চারপাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখার অভিযোগও রয়েছে। অন্যদিকে পুরোনো প্রশাসনিক ভবনের সামনে থাকা উদ্বোধনী ফলকটি বিভিন্ন সময় ফুলের টব ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে আড়াল করে রাখা হতো।
তবে ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দুই ফলকই পরিমার্জন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, সীমানার বাইরে থাকায় ভিত্তিপ্রস্তরটির আশপাশে দীর্ঘদিন ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা হতো। তিনি দাবি করেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন সময়ে এটি পরিষ্কার ও রং করেছেন। তার প্রত্যাশা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জমি অধিগ্রহণ করে ভিত্তিপ্রস্তর ও ঐতিহাসিক বটগাছকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার মধ্যে নিয়ে আসবে।
জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইমদাদুল হুদা বলেন, ভিত্তিপ্রস্তরের পাশ দিয়ে আগে রাস্তা ছিল। পরবর্তীতে সেই রাস্তা বন্ধ করে শিউলিমালা হল নির্মাণ করা হয়। পরে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের সময়ও ভিত্তিপ্রস্তরটি সীমানার বাইরে থেকে যায়।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. তানজিল হোসেনের দাবি, ভিত্তিপ্রস্তরটি সীমানার বাইরে রাখার বিষয়টি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ও সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, ভিত্তিপ্রস্তরটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার ভেতরে আনার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে। জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হলে ভিত্তিপ্রস্তরটি সীমানার মধ্যে আনা হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ভিত্তিপ্রস্তরটি বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে রয়েছে। এটিকে সীমানার ভেতরে নিয়ে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক বটতলাকেও সংরক্ষণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের মতে, নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত বটতলা ও ভিত্তিপ্রস্তর শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের অংশ নয়, ত্রিশালের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। তাই এগুলো সংরক্ষণ ও যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।