বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর লক্ষ্য থাকে একটি ভালো চাকরি। কেউ বিসিএস প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, কেউ কর্পোরেট ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্নে বিভোর। তবে এই প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ফাহাদ বিন সাঈদ। অনার্স প্রথম বর্ষে মাত্র ১০টি গরু নিয়ে যাত্রা শুরু করা তার খামার আজ প্রায় ৭০টি গরুর আধুনিক খামারে পরিণত হয়েছে।
২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই নিজের কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন ফাহাদ। ছোটবেলা থেকেই কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতের প্রতি আগ্রহ থাকায় পড়াশোনার পাশাপাশি গরুর খামার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বড় ভাইয়ের উৎসাহ ও সহযোগিতা পেয়েছিলেন বলে জানান তিনি।
খামার শুরু করার আগে গরু পালন, খাদ্য ব্যবস্থাপনা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারজাতকরণ বিষয়ে ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ করেন ফাহাদ। অভিজ্ঞ খামারিদের সঙ্গে কথা বলে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টা করেন। এরপর মাত্র ১০টি গরু নিয়ে ছোট পরিসরে যাত্রা শুরু করেন। শুরুতে খাদ্য সরবরাহ, পরিচর্যা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ প্রায় সব কাজ নিজেই তদারকি করতেন। তিনি বলেন, “শুরুতে অনেক ভুল হয়েছে। তবে প্রতিটি ভুল থেকেই শিক্ষা নিয়েছি। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা বেড়েছে, খামারের পরিধিও বড় হয়েছে বর্তমানে তার খামারে প্রায় ৭০টি গরু রয়েছে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে গরু মোটাতাজাকরণ ও উন্নত পরিচর্যার মাধ্যমে বাজারের জন্য প্রস্তুত করা হয়। তাদের লক্ষ্য শুধু গরুর সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং সুস্থ, নিরাপদ ও মানসম্পন্ন গরু উৎপাদন।
খামারের শুরুতেই গরু ক্রয়, শেড নির্মাণ, খাদ্য সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরিতে প্রায় অর্ধকোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে খামারের পরিসর বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ২ কোটিতে পৌঁছেছে। একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে খামার পরিচালনার পথে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে ফাহাদকে। বাস্তব অভিজ্ঞতার অভাব, গরুর রোগব্যাধি, বাজারের ওঠানামা এবং দক্ষ কর্মচারীর সংকট ছিল বড় বাধা। পাশাপাশি সামাজিক নানা সমালোচনাও শুনতে হয়েছে তাকে।
ফাহাদ বলেন, “অনেকেই বলতেন, এত পড়াশোনা করে শেষ পর্যন্ত গরুর ব্যবসা করবে? কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, কোনো কাজই ছোট নয়। আজকের অবস্থানে আসতে সেই বিশ্বাসই আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।”
বর্তমানে তার খামারে নিয়মিত তিনজন কর্মচারী কাজ করেন। কোরবানির ঈদের আগে অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে খামারটি সরাসরি ও পরোক্ষভাবে বেশ কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
গরুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে নিয়মিত ভ্যাকসিন ও কৃমিনাশক প্রয়োগ করা হয়। পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস এবং সুষম খাদ্যের ব্যবস্থা রাখা হয়। ঘাস, খড়, ভুসি ও ভুট্টাসহ প্রাকৃতিক খাদ্যের মাধ্যমে গরুগুলোকে লালন-পালন করা হয় এবং নিয়মিত পশুচিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া হয়। 
খামারের আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, সব ধরনের খরচ বাদ দিয়ে প্রতি গরুতে গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ লাভ পাওয়া যায়। তবে ফাহাদের মতে, আর্থিক লাভের চেয়েও বড় অর্জন মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস।
তিনি বলেন, “সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনার কারণে ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জন করতে পেরেছি। পাশাপাশি কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পেরেছি, এটিই আমার সবচেয়ে বড় সাফল্য।”
ভবিষ্যতে খামারকে আরও আধুনিক ও বৃহৎ পরিসরে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে ফাহাদের। উন্নত জাতের গরু পালন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং একটি আদর্শ খামার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। 
তরুণদের উদ্দেশে তার আহ্বান, শুধু চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হওয়ার চিন্তা করা উচিত। কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে রয়েছে ব্যাপক সম্ভাবনা, যা নিজের পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ফাহাদের এই সফলতার গল্প প্রমাণ করে, ইচ্ছাশক্তি, পরিকল্পনা ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে শিক্ষাজীবন থেকেই সফল উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব।